

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষে সোমবার থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে যাওয়ায় কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন হাজারো মানুষ। ঈদের আগে ও ছুটির সময়ে তুলনামূলক নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারলেও ছুটি শেষে ফেরার পথে নোয়াখালীর হাতিয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের অপেক্ষায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ফেরি ছেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। রোববার (৩১ মে) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত হাতিয়ার নলচিরা ফেরিঘাটে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ফেরি ‘মহানন্দা’ ছেড়ে যেতে বিলম্ব হওয়ায় শত শত যাত্রী, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল আরোহীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হান্নান মাসউদের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফেরি মহানন্দা রোববার বিকেল সোয়া ৪টায় চেয়ারম্যানঘাট থেকে ছেড়ে আসে। যেটি বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে নলচিরা ঘাটে পৌঁছে। সাধারণত ফেরি ভিড়ার পর যাত্রী, মালামাল ও যানবাহন ওঠানামা সম্পন্ন করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। সে হিসেবে সন্ধ্যা ৭টার আগেই ফেরিটির পুনরায় চেয়ারম্যানঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। সে ফেরি ছাড়ে রাত প্রায় ৯টায়। যাত্রীদের অভিযোগ, সংসদ সদস্যের আগমনের অপেক্ষায় ফেরিটি দীর্ঘ সময় ঘাটে নোঙর করে রাখা হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ফেরিটি চেয়ারম্যানঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। যাত্রীরা জানান, বিকেল থেকেই মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের বুকিং নেওয়া হলেও ফেরি ঘাটে ভেড়ার পর দীর্ঘ সময় গাড়ি উঠাতে দেওয়া হয়নি। এতে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়ের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। অপেক্ষমাণ কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও ফেরি না ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, এমপি সাহেব আসবেন, তারপর ফেরি ছাড়বে। একজন জনপ্রতিনিধির জন্য শত শত সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক যাত্রীরই রাতের মধ্যে চেয়ারম্যানঘাট হয়ে সোনাপুর, মাইজদী কিংবা ঢাকাগামী বাস ধরার পরিকল্পনা ছিল। ফেরি দেরি করায় তাদের অনেকের নির্ধারিত পরিবহন মিস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। যাত্রী শরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে বাস কাউন্টারে রাত কাটাতে হবে। অনেকের আবার পরদিন অফিসে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ একজন ব্যক্তির জন্য এত মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ঢাকা থেকে হাতিয়ায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা হিমেল নামে এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল নির্ধারিত সময়েই ফেরি ছাড়বে। তাই বিকেল ৪টা থেকেই গাড়ির সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়ও ফেরি ছাড়েনি। পরে জানতে পারলাম স্থানীয় এমপি আসবেন বলে ফেরি আটকে রাখা হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধির কাণ্ডজ্ঞান থাকা উচিত। একজনের জন্য এত মানুষের কষ্ট হওয়া উচিত নয়। ফেরি মহানন্দার মাস্টার মোজাম্মেল হক বলেন, বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে ফেরি নলচিরা ঘাটে পৌঁছায়। সাধারণত আনলোড ও লোড করতে ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা সময় লাগে। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এমপি সাহেব আসবেন, তাই ফেরি ছাড়তে কিছুটা দেরি হবে। এজন্য শুরুতে গাড়িগুলো উঠতে দেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, এ নিয়ে যাত্রীরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। পরে রাত ৮টার পর ফেরিটি চেয়ারম্যানঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তবে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা বিলম্ব হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হান্নান মাসউদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে বিষয়টি নিয়ে তার সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট করেছেন। এসব পোস্টে দাবি করা হয়, ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশে নির্দিষ্ট সময়ে হাতিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছান সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হান্নান মাসউদ। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর তাকেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তাদের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহল ও অসাধু সিন্ডিকেট সংসদ সদস্যকে রাজনৈতিকভাবে হেয় ও ব্যর্থ প্রমাণ করার উদ্দেশে পরিকল্পিতভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এমপি ঘাটে পৌঁছানোর আগেই ওই চক্রটি মোটরসাইকেল, ট্রাক ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন ফেরিতে না তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখে। এর ফলে ঘাটসংলগ্ন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে। সমর্থকদের পোস্টে আরও বলা হয়, ফেরিঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদ সদস্য। একই সঙ্গে এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে সজাগ ও সতর্ক থাকারও আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে ফেরি বিলম্বের প্রকৃত কারণ নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ এবং সংসদ সদস্যের সমর্থকদের দাবির মধ্যে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই যাত্রীসেবার স্বার্থে ফেরি পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সময়সূচি মেনে চলার দাবি জানিয়েছেন।